তারল্য সংকট

ঋণের কিস্তি পরিশোধে চাপে একসময়ের সবল কোম্পানি আশুগঞ্জ পাওয়ার

রাষ্ট্রায়ত্ত অনেক প্রতিষ্ঠান যখন ধারাবাহিকভাবে লোকসান গুনছে সেখানে ব্যতিক্রমী উদাহরণ ছিল আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেড (এপিএসসিএল)। আয় ও মুনাফার দিক দিয়ে কোম্পানিটির পারফরম্যান্স ছিল ঈর্ষণীয়।

রাষ্ট্রায়ত্ত অনেক প্রতিষ্ঠান যখন ধারাবাহিকভাবে লোকসান গুনছে সেখানে ব্যতিক্রমী উদাহরণ ছিল আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেড (এপিএসসিএল)। আয় ও মুনাফার দিক দিয়ে কোম্পানিটির পারফরম্যান্স ছিল ঈর্ষণীয়। কিন্তু বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির পারফরম্যান্স ক্রমেই ম্রিয়মাণ হচ্ছে। বিশেষ করে তারল্য সংকটের কারণে ঋণের কিস্তি পরিশোধে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে আশুগঞ্জ পাওয়ারকে। অন্যদিকে নিট মুনাফা কমার পাশাপাশি ব্যাংক আমানতের অর্থ ভেঙে পরিচালন ব্যয় মেটাতে হচ্ছে কোম্পানিটিকে।

১৯৬৬ সালে জার্মান সরকারের অর্থায়নে ৩১১ একর জমি অধিগ্রহণ করে আশুগঞ্জ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। প্রাথমিকভাবে ১২৮ মেগাওয়াট সক্ষমতার দুটি ইউনিট নির্মিত হয়। ১৯৭০ সালে এ ইউনিট দুটি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায়। ভৌগোলিকভাবে যাতায়াত ও বাণিজ্য সুবিধা থাকায় সেখানেই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করে তৎকালীন সরকার। ২০০৩ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানি হিসেবে যাত্রা করে আশুগঞ্জ পাওয়ার। বর্তমানে কোম্পানিটির অধীনে ছয়টি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে, যেগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৬৪৭ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ৫০ মেগাওয়াট জিইপিপি, ২২৫ মেগাওয়াট সিসিসিপি, ২০০ মেগাওয়াট মডুলার (ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে যৌথ মালিকানায়), ৪৫০ মেগাওয়াটের সিসিসিপি (দক্ষিণ), ৪৫০ মেগাওয়াটের সিসিসিপি (উত্তর) ও ৪০০ মেগাওয়াটের সিসিসিপি (পূর্ব) বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে।

আশুগঞ্জ পাওয়ারের ২২৫ মেগাওয়াট সিসিসিপি বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ২০১৫ সালের ২৭ এপ্রিল বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসে। এ কেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৪৮ কোটি টাকা। কেন্দ্রটির ১৪৫ মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক ও ৮০ মেগাওয়াট স্টিম টারবাইন। এর মেয়াদ ২৫ বছর। দেশে ইসিএর (এক্সপোর্ট ক্রেডিট এজেন্সি) অর্থায়নে নির্মিত প্রথম বিদ্যুৎ কেন্দ্র এটি। আশুগঞ্জ পাওয়ারের পাশাপাশি এ কেন্দ্রে জার্মানির হার্মেস ও দক্ষিণ কোরিয়ার কে-সিউর ইসিএ অর্থায়ন করেছে। এর মধ্যে কে-সিউরের কাছ থেকে ১২ কোটি ৩৮ লাখ ৪২ হাজার ১৪০ ডলারের ঋণ নেয়া হয়েছে। লাইবরের সঙ্গে ২ দশমিক ৭ শতাংশ মার্জিন ও অত্যাবশ্যকীয় ব্যয় (যদি থাকে) যোগ করে ঋণের সুদ নির্ধারণ করা হয়েছে। হার্মেসের কাছ থেকে এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ৬ কোটি ৯১ লাখ ১ হাজার ৮৪৪ ডলারের ইসিএ ঋণ নেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে লাইবরের সঙ্গে ২ দশমিক ২ শতাংশ মার্জিন ও অত্যাবশ্যকীয় ব্যয় (যদি থাকে) যোগ করে ঋণের সুদ নির্ধারণ করা হয়েছে। দুই ক্ষেত্রেই ছয় মাস পর পর ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হয়।

ইসিএ ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুসারে পরবর্তী কিস্তির সমপরিমাণ অর্থ আশুগঞ্জ পাওয়ারকে আগেই ব্যাংকে জমা রাখতে হয়। তবে ২০২৫ সালের জুন শেষে এপিএসসিএল এ কিস্তির অর্থ জমা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে বলে জানিয়েছেন কোম্পানিটির নিরীক্ষক। আশুগঞ্জ পাওয়ারের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করেছেন একনাবিন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের পার্টনার মো. মমিনুল করিম। তিনি আর্থিক প্রতিবেদনে প্রদত্ত নিরীক্ষকের মতামতে জানিয়েছেন, ৩০ জুন ২০২৫ শেষে কোম্পানিটিকে ঋণের কিস্তি বাবদ ১৩১ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যাংকে জমা রাখার কথা ছিল। যদিও এ সময়ে কোম্পানিটির ব্যাংক হিসাবে মাত্র ১৬ কোটি ৫১ লাখ টাকা জমা ছিল। তারল্য সংকটের কারণে আশুগঞ্জ পাওয়ার এ অর্থ জমা রাখতে পারেননি বলে জানিয়েছেন নিরীক্ষক।

বিদ্যুতের একক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) দেশের সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনে এবং এর বিপরীতে বিল পরিশোধ করে। তবে এক্ষেত্রে বিদ্যুৎ কেনার অর্থ পরিশোধের জন্য বিপিডিবিকে সরকারের তহবিলের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে সরকারের কাছ থেকে অর্থ না পেলে বিপিডিবির পক্ষে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বিল পরিশোধ করা সম্ভব হয় না। এ অবস্থায় প্রায়ই বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর পাঁচ-ছয় মাসের মতো বিল বকেয়া পড়ে যায়।

বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের যে পরিমাণ আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে তা দিয়ে সব প্রতিষ্ঠানের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয় না। ডিসেম্বরে অনেক প্রতিষ্ঠানই আমাদের কাছে টাকা চেয়েছে, এর মধ্যে আশুগঞ্জ পাওয়ারও রয়েছে। যখন যে প্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোধের সময় হয় তখন আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাদের অর্থ দিয়ে থাকি। এক্ষেত্রে শতভাগ দেয়া সম্ভব না হলেও চেষ্টা করি। আশুগঞ্জ পাওয়ার আমাদের কাছে ৩৫০ কোটি টাকা চেয়েছিল, তার মধ্যে ২০০ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। চলতি সপ্তাহে প্রতিষ্ঠানটিকে আরো কিছু টাকা দেয়া হবে।’

৩০ জুন ২০২৫ শেষে আশুগঞ্জ পাওয়ারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৩৬০ কোটি টাকায়। এর মধ্যে বিদেশী ঋণ ৪ হাজার ৬০৩ কোটি ও সরকারের কাছ থেকে নেয়া ঋণ ৭৫৭ কোটি টাকা। তারল্য সংকটের কারণে সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্বল্পমেয়াদি আমানতের অর্থ ভেঙে ব্যয় করতে হয়েছে কোম্পানিটিকে। আলোচ্য অর্থবছর শেষে ব্যাংকে গচ্ছিত কোম্পানিটির স্বল্পমেয়াদি আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬২ কোটি ৮৮ লাখ টাকায়। আগের অর্থবছরে এ আমানতের পরিমাণ ছিল ২৪৮ কোটি টাকা।

আশুগঞ্জ পাওয়ারের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটির আয় ও মুনাফায় সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর মধ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরে কোম্পানিটির ২ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা আয়ের বিপরীতে নিট মুনাফা হয়েছে ২৪৭ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে ২ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা আয়ের বিপরীতে নিট মুনাফা ছিল ১৮৭ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩ হাজার ৩৮১ কোটি টাকা আয়ের বিপরীতে ২৪৫ কোটি টাকার নিট মুনাফা করেছিল কোম্পানিটি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কোম্পানিটির আয় ৪ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকায় দাঁড়ায় এবং এ সময়ে নিট মুনাফা হয় ৪৮৯ কোটি টাকা। সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আশুগঞ্জ পাওয়ারের ৩ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা আয় এবং নিট মুনাফা হয়েছে ১৯৪ কোটি টাকা।

গত অর্থবছরে আয় কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে আশুগঞ্জ পাওয়ারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ সময়ে তাদের তিনটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ ছিল। এর মধ্যে ৪৫০ মেগাওয়াট সিসিসিপি (দক্ষিণ) বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ৪ মাস ২৪ দিন, ৪৫০ মেগাওয়াট সিসিসিপি (উত্তর) বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ৫৩ দিন এবং ৪০০ মেগাওয়াট সিসিসিপি (পূর্ব) বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ১০ মাস বন্ধ ছিল। ফলে গত অর্থবছরে জাতীয় গ্রিডে আগের তুলনায় কোম্পানিটির বিদ্যুৎ সরবরাহ কমেছে ১৭ শতাংশ।

জানতে চাইলে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনের কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ আবুল মনসুর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ইসিএ ঋণের ক্ষেত্রে একটি কিস্তির টাকা আগাম ব্যাংকে জমা রাখতে হয়। আমাদের দুটি ইসিএ ঋণ রয়েছে। এর মধ্যে গত আগস্টে একটি ঋণ শোধ হয়ে গেছে। আরেকটি ২৩ ডিসেম্বর (আজ) কিস্তি শোধ করলে শেষ হয়ে যাবে। গত জুনে এই শেষ কিস্তির অর্থ জমা রাখার কথা থাকলেও সে সময় আমরা বিপিডিবির কাছ থেকে বিল না পাওয়ার কারণে তা রাখতে পারিনি। আমাদের প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার মতো বিল বকেয়া রয়েছে। তবে এরই মধ্যে আমরা বিপিডিবির কাছ থেকে টাকা পেয়েছি এবং আগামী ২৩ তারিখে (আজ) এ ঋণের শেষ কিস্তির অর্থ পরিশোধ করে দেব।’

আরও